Article
কলেজ স্কোয়ার, অশোক সেন, সুপারসিমেট্রি আর সেসব দুপুর
মনে করুন, একটা কাঁচি দিয়ে চুম্বকটা মধ্যিখান থেকে কেটে ফেলা হলো। কী আশ্চর্য! দেখব, দুটো টুকরোরই আবার নিজস্ব নর্থ পোল আর সাউথ পোল তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ চুম্বকটাকে কেটে আমরা এমন একটা টুকরো বানাতে পারলাম না, যার শুধু নর্থ পোল আছে, সাউথ পোল নেই, অথবা শুধু সাউথ পোল আছে, নর্থ পোল নেই। কিন্তু এমন একটা বস্তু কি কল্পনা করা যায়, যার কেবল এক ধরনের চৌম্বকীয় মেরু রয়েছে? শুধু নর্থ পোল, অথবা শুধু সাউথ পোল?
সেই ছেলেটা বলেছিলো
অনেক দিন আগের কথা। তখন কলেজ স্কোয়ারের একটা চায়ের দোকানে প্রায় রোজই যেতাম। বসে বসে জ্যামিতির অঙ্ক কষতাম। বন্ধুবান্ধব এলে আড্ডা দিতাম। সে সব বিচিত্র আড্ডা! নানা রকমের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতো। কেউ কবিতা লেখে, কেউ রাজনীতি করে, কেউ সাহিত্যচর্চা করে, কেউ সিনেমা বানায়। কেউ বা স্বপ্ন দেখছে, পদার্থবিদ্যা কিংবা গণিত নিয়ে পড়াশোনা করবে, নতুন কিছু আবিষ্কার করবে।
এমনই এক সময় আলাপ হয়েছিল এক যুবকের সঙ্গে। সে তখন প্রেসিডেন্সিতে পড়াশোনা শেষ করে সদ্য হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে গিয়েছে। এলাহাবাদ শহরে। ছেলেটি আমাকে এক অদ্ভুতকর্মা পদার্থবিদের গল্প শুনিয়েছিল। তাঁর নাম অশোক সেন।
আমি পদার্থবিদ্যার কিছুই জানি না। বস্তুত, তাঁকে বরাবরই বেশ ভয় করে চলি। ছেলেটি বোধহয় আমাকে তাদের দলে টানার জন্যই বলেছিল যে স্ট্রিং থিওরি ব্যাপারটা নাকি অনেকটাই অঙ্ক আমিও খানিকটা বিশ্বাস করে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম।
কিন্তু সত্যি বলতে কী, আশপাশের পৃথিবীতে কী ঘটছে, ব্রহ্মাণ্ডের আসল রহস্য কী, এসব নিয়ে আমার খুব একটা মাথাব্যথা কোনো কালেই ছিল না। বরং একটা জ্যামিতির ছবি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতে পারলেই আমি বেঁচে যাই।
সে যাই হোক, সেই সময় অশোক সেনের কাজকর্ম নিয়ে পড়তে গিয়ে কিছু কিছু নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।
যেমন, সুপারসিমেট্রি (Supersymmetry)
ব্যাপারটা আমার কাছে কিন্তু ততটা অদ্ভুত ঠেকেনি। ওই যুবকটির কাছে যতটুকু বুঝেছিলাম, সুপারসিমেট্রি বলতে এক ধরনের গাণিতিক প্রতিসাম্য বোঝায়।
পদার্থবিদ্যায় বোসন আর ফার্মিয়ন বলে দুই ধরনের কণা রয়েছে। তাদের মধ্যে পার্থক্য কী, সে বিষয়ে আমার তখন বিশেষ কিছু জানা ছিল না। এখনও নেই। কিন্তু গণিতের একটা মজা হচ্ছে, সব সময় সব কিছুর অর্থ জানার প্রয়োজন পড়ে না। ভাবনার রেলগাড়ি দিব্যি ছুটতে থাকে।
আমি এইটুকু ভেবেই বেশ খুশি ছিলাম যে বোসন বলে কিছু একটা আছে, ফার্মিয়ন বলেও কিছু একটা আছে। তাঁরা জবরদস্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ কণা। আর তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করার কিছু বিশেষ গাণিতিক অপারেটর (ফাংশন) রয়েছে।
এই অপারেটরগুলো বোসনিক অবস্থাকে ফার্মিয়নিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত করতে পারে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রতিসাম্যের সাহায্যে সম্পর্কিত অবস্থাগুলোর শক্তি বা এনার্জি একই থাকে।
এবার ওই এনার্জি কাকে বলে, তা নিয়েও আমার বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কিছু একটা হবে। তাঁর অপরিবর্তিত থাকাটা কোনো এক অমোঘ প্রয়োজনে গুরুত্ত্বপূর্ণ।
আসলে প্রতিসাম্য বা সিমেট্রি শব্দটাই আমার কাছে খুব আকর্ষণীয়।
আমি যখন জ্যামিতি করি, তখন সিমেট্রি বলতে অনেক সময় এমন একটা ফাংশন বুঝি, যা গোটা ছবিটাকে নড়াচড়া করাতে পারে, অথচ ছবির যেকোনো দুটি বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্ব একই রেখে দেয়। এ হচ্ছে এক ধরণের সিমেট্রি। এমন রূপান্তরকে আমরা আইসোমেট্রি বলি। অবশ্য আরো অন্য অন্য বহু রকমের সিমেট্রির ধারণা সম্ভব। আমার পিএইচডির বিষয় ছিলো জ্যামিতিক গ্রুপ থিয়োরি। বহু রকমের সিমেট্রির সাথে পরিচয় ঘটেছে সে সময়।
পদার্থবিদ্যার সুপারসিমেট্রি অবশ্য অন্য ধরনের গাণিতিক বস্তু। কিন্তু কোনো রূপান্তরের মধ্যেও বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থেকে যাওয়ার এই ধারণাটা আমার খুব চেনা।
সম্প্রতি পড়লাম, অশোক সেন মহাশয় ২০২৬ সালের অস্কার ক্লাইন পেয়েছেন। খবরটা পড়ে অবধি সেই যুবকের কথা মনে পড়ছিল। হয়তবা পুরোনো বন্ধুত্ত্ব ঝালিয়ে নেওয়ার খাতিরে সেন মহাশরের পেপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। সম্ভবত আরো এক ব্যর্থ চেষ্টা।
যেটুকু বুঝেছি, তার একটা অংশ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে। কোথাও ভুল থাকলে অবশ্যই জানাবেন।
একমুখি চুম্বক
ছোটবেলায় চুম্বক নিয়ে খেলতাম। অলৌকিক ব্যাপার মনে হত। কেমন লোহাকে সে বেমালুম টেনে নেয়!
চুম্বকের একটা উত্তর মেরু থাকে, যাকে বলে নর্থ পোল। আর একটা দক্ষিণ মেরু থাকে (সাউথ পোল)। এবার এই নর্থ পোল জিনিসটা খায় না মাথায় দেয়, কেনই বা থাকে, সে বিষয়ে আমার কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু ছেলেবেলায় চুম্বক নিয়ে খেলতে গিয়ে এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছিলাম - চুম্বকের দুই প্রান্ত দুই রকমের আচরণ করে।
এবার মনে করুন, একটা কাঁচি দিয়ে চুম্বকটা মধ্যিখান থেকে কেটে ফেলা হলো। কী আশ্চর্য! দেখব, দুটো টুকরোরই আবার নিজস্ব নর্থ পোল আর সাউথ পোল তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ চুম্বকটাকে কেটে আমরা এমন একটা টুকরো বানাতে পারলাম না, যার শুধু নর্থ পোল আছে, সাউথ পোল নেই, অথবা শুধু সাউথ পোল আছে, নর্থ পোল নেই।
কিন্তু এমন একটা বস্তু কি কল্পনা করা যায়, যার কেবল এক ধরনের চৌম্বকীয় মেরু রয়েছে? শুধু নর্থ পোল, অথবা শুধু সাউথ পোল?
এই ধরনের কাল্পনিক বস্তুকে বলা হয় ম্যাগনেটিক মনোপোল।
পদার্থবিদরা বহুদিন ধরে এমন কণার সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। আমাদের বাস্তব জগতে এখনও কোনো মৌলিক ম্যাগনেটিক মনোপোলের অস্তিত্ব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়নি। কিন্তু আজও পাওয়া যায়নি বলে কোনো দিনই পাওয়া যাবে না, এমনটা তো বলা চলে না!
আমার কাছে এই প্রশ্নটাই আশ্চর্য সুন্দর।
একটা চুম্বককে দুটো টুকরো করে ফেলার পরেও যে নর্থ পোল আর সাউথ পোল একসঙ্গে থেকে যায়, সেই সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এমন একটা জগৎ কি হতে পারে, যেখানে তারা আলাদা আলাদাভাবে অস্তিত্বশীল?
এমন প্রশ্ন করার জন্যও বোধহয় এক ধরনের শিশুসুলভ কল্পনাশক্তির প্রয়োজন।
এবার আরও এক ধাপ এগোনো যাক।
মনে করুন, এমন একটা জগৎ আমরা গাণিতিকভাবে তৈরি করলাম, যেখানে এই মনোপোলের অস্তিত্ব রয়েছে। শুধু তাই নয়, সেখানে সুপারসিমেট্রিও রয়েছে। অর্থাৎ, বোসনিক আর ফার্মিয়নিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী বিশেষ গাণিতিক প্রতিসাম্য রয়েছে।
এই ধরনের একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর নাম N = 4 Supersymmetric Yang–Mills Theory।
এমন তত্ত্বে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মনোপোলের গাণিতিক সমাধান পাওয়া যায়।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে, এই মনোপোলগুলো কি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকতে পারে?
বাউন্ড স্টেট
ব্যাপারটা একটু অন্যভাবে ভাবা যাক। একটা হাইড্রোজেন পরমাণুর কথা মনে করুন। সেখানে একটা ইলেকট্রন আর একটা প্রোটন পরস্পরের আকর্ষণে একটি যৌথ অবস্থায় রয়েছে। এই ধরনের অবস্থাকে পদার্থবিদ্যার ভাষায় বলা হয় বাউন্ড স্টেট (Bound State)।
এবার ভাবুন, আমাদের সেই বিচিত্র সুপারসিমেট্রির জগতে দুটি মনোপোলও কি এমন কোনো বাউন্ড স্টেটে থাকতে পারে? এমনকি তাদের চৌম্বকীয় আধান যদি একই ধরনের হয়, তাহলেও?শুধু মনোপোলের অস্তিত্ব থাকলেই যে এমন বাউন্ড স্টেট থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেটা নির্ভর করবে আমাদের তত্ত্বের বৈশিষ্ট্যের ওপর। আর এখানেই অশোক সেনের একটি অসাধারণ কাজের কথা আসে।
এর আগে অবশ্য আরেকটি শব্দের সঙ্গে পরিচয় করা দরকার - S-duality।
এটিও এক ধরনের গভীর গাণিতিক প্রতিসাম্য। খুব সরল করে বললে, এটি এমন একটি সম্পর্কের কথা বলে, যেখানে কোনো তত্ত্বে কণাদের মধ্যে দুর্বল মেলামেশার হিসেবকে তাদের প্রবল মেলামেশার হিসেবের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়। বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় আধানের মধ্যেও এক আশ্চর্য সম্পর্ক তৈরি হয়।
এই S-duality সত্যি হলে কিছু বিশেষ ধরনের কণা এবং তাদের বাউন্ড স্টেটের অস্তিত্ব থাকার কথা। অনেকটা পূর্বাভাসের মত। কিন্তু পূর্বাভাস দেওয়া আর স্বাধীনভাবে গাণিতিক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা তো এক কথা নয়!
১৯৯৪ সালে অশোক সেন একটি গবেষণাপত্রে এই বিষয়েই অসাধারণ একটি ফলাফল দেখিয়েছিলেন।
দুই-মনোপোলের একটি বিশেষ তাত্ত্বিক কাঠামোয় তিনি নির্দিষ্ট বাউন্ড স্টেটগুলোর অস্তিত্ব গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এখানে একটা কথা বলা দরকার। এগুলোকে শুধুই দুটি সাধারণ মনোপোলের জড়িয়ে থাকা ভাবলে পুরো ব্যাপারটা ধরা পড়ে না। এই অবস্থাগুলোর সঙ্গে বৈদ্যুতিক আধানও জড়িত। বৈদ্যুতিক এবং চৌম্বকীয়, দুই ধরনের আধানযুক্ত এমন অবস্থাকে বলা হয় ডায়ন (Dyon)।
অশোক সেনের গণনার সঙ্গে S-duality থেকে পাওয়া পূর্বাভাসের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায় আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, তিনি এই বাউন্ড স্টেটগুলোর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে S-duality সত্যি বলে ধরে নেননি। তিনি একেবারে অন্য গাণিতিক পথে এগিয়েছিলেন।
আমার কাছে ব্যাপারটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই। কোনো পরীক্ষাগারে মনোপোল আবিষ্কার না করেও আমরা একটি তাত্ত্বিক জগৎ নির্মাণ করতে পারছি। সেখানে কী ধরনের কণা থাকতে পারে, তারা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, এমনকি তাদের কোন কোন যৌথ অবস্থার অস্তিত্ব সম্ভব, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি গণিতের সাহায্যে। আর সেই উত্তরগুলো কখনো কখনো আমাদের সামনে আরও গভীর কোনো প্রতিসাম্যের ইঙ্গিত নিয়ে আসছে।
অশোক সেনের কাজ অবশ্য এই একটি ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্ট্রিং থিওরি, ব্ল্যাক হোল এবং আরও বহু বিষয়ে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। আমি সেসবের কিছুই জানিনা। কিন্তু সেই বহুকাল আগের সেই আড্ডার প্রতি একটা দায় বোধহয় আজও থেকে গেছে। অলৌকিক অবন ঠাকুরের জগৎ যেন... একটি অদেখা কণা মনোপোল...সে জগতের সুপারসিমেট্রি... আর মনোপলের সম্ভাব্য যৌথ অবস্থার অস্তিত্ব... সব গিয়ে মিশেছে গভীর জ্যামিতির জগতে। আর সেই জ্যামিতির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে আছে (হয়তবা) পদার্থবিদ্যার এক আশ্চর্য সত্য।
সেন মহাশয়কে সেলাম।
আর আমার এই সামান্য বোঝার চেষ্টায় কোনো ভুল থেকে থাকলে, জানালে খুবই উপকৃত হব।
আগ্রহীদের জন্য: অশোক সেনের ১৯৯৪ সালের মূল গবেষণাপত্রটি এখানে পড়া যাবে:
Comments
Sign in to join the conversation.